হাওয়াবদল

0
1612
Image Source : Google

ট্রেন থেকে নেমেই ট্যাক্সি বুক করলো অমৃতা, “ড্রাইভার দা, একটু জলদি চলুন না, আমার দেরি হয়ে গেছে” ….অমৃতা, ইংরেজিতে তে এমএ, বিএড ও করা আছে, কিন্তু সরকারি চাকরি জোটেনি, তাই অগত্যা প্রাইভেট কোম্পানি তেই চেষ্টা চালিয়ে যায় এখন….প্রাইভেট চাকুরী পায়না বললে ভুল বলা হবে, কিন্তু মাইনের অঙ্কটা যে বড্ডো কম, কলকাতার মতো শহরে মেসে থাকলে থাকা খাওয়া তেই সব খরচ বেড়িয়ে যাবে তাই কিছু চাকরি পেয়েও মাইনের অংক শুনে পিছিয়ে এসেছে অমৃতা ….কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় অমৃতা, ছোট্ট ইচ্ছে “বিয়ের আগে নিজের পায়ে দাঁড়াবো নাহলে বিয়েই করবো না যতদিন না ভালো চাকরি জোটে” ….বাবার পয়সার অভাব নেই,বামফ্রন্ট আমলে এক ডাকে কমরেড অনিমেষ বাবু বললেই এলাকার মানুষ চিনতো .. কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা অনেক মেয়েরই ইচ্ছে ….তাই এই কোম্পানির ইন্টারভিউর ডাক পেয়েই ছুটে এসেছে,এখানে মাইনে টা বেশ ভালো, ২২ হাজার টাকা মাইনে..

ট্যাক্সি এসে গেছে ঠিকানায়, কোম্পানির বিল্ডিং দেখে অমৃতা অবাক হলো ….”ঝাঁ চকচকে বিল্ডিং, ছবির মতো সাজানো সুন্দর ক্যাম্পাস, সোনালী ফ্রেমে বড় হোডিংএ লেখা “রাহুল এন্টারপ্রাইজ” ….”ভগবান এখানে যেন আমার চাকরিটা হয়ে যায়” বিড়বিড় করতে করতে কোম্পানির মেন গেটে ঢুকলো অমৃতা….দারোয়ান কে ইন্টারভিউ লেটারের কপি দেখিয়ে প্রবেশ করে অমৃতা …ওয়েটিং রুমে লাস্ট মিনিট সাজেশন যেন ঝালাই করে নিচ্ছিলো অমৃতা….একজন অফিসকর্মী এসে বললো “ম্যাডাম, একটু অপেক্ষা করুন, এটা সিনিয়র পোস্টের চাকরি তাই ইন্টারভিউ টেবিলে স্যার অর্থাৎ আমাদের মালিক থাকবেন, উনি ৩০ মিনিট পর আসবেন” ..অপেক্ষা করছে অমৃতা আর ফাইলে সিভি ও সব ডকুমেন্টস গুলো শেষবার ঝালাই করে নিচ্ছে …. মিনিট ৪০ পরে ইন্টারভিউ রুমে ডাক আসে অমৃতার….স্যার এর কাছে পার্সোনাল ইন্ট্রোডাকশন ও কিছু প্রশ্ন উত্তর দেবার পর, অমৃতার সিভিতে স্কুল, কলেজ, জায়গার নাম, বাবার নাম সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন এবং তারপর ইন্টারভিউ শেষ হলো ….বলা হলো অমৃতাকে, জানিয়ে দেওয়া হবে ৩ দিনের ভেতরে ইমেল করে ….অমৃতা বাড়ি ফেরার পথে, ট্রেনের জানলার ধারে বসে হেডফোনে গান শুনছে আর ভাবছে “স্যার কে কেমন চেনা চেনা লাগছিলো, কোথাও যেন দেখেছি” “আর সিভি টা অমন অবাক হয়েই বা কেন দেখছিলেন” ..যেন একটা চেনা হিসেব মিলছিলোনা অমৃতার ..যাই হোক, বাড়ি ফেরে অমৃতা এবং ৩ দিনের মধ্যেই ইমেল আসে অমৃতার, ইমেল খুলতেই অবাক হলো অমৃতা, “এটা কিভাবে সম্ভব”, জীবনের সবথেকে অবাক হবার দিন যেন আজ..ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে গেলো অমৃতা ….

সময়টা ১৩ বছর আগের কথা, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ক্লাসেরই একটি ছেলে হটাৎ রাস্তায় অমৃতাকে বলে ” আমার ভালো লাগে তোকে,বিশ্বাস কর খুব ভালো লাগে, হয়তো ভালোবাসি, খারাপ ভাবিস না, অনেকদিন থেকেই কথা টা মনের মধ্যেই আটকে রেখেছি, আজ সব বলে দিলাম, বাকিটা তোর ওপর, আমি জোর করবো না” ..পড়াশুনাতে অমৃতা যেখানে খুবই ভালো সেখানে ছেলেটি লাস্ট বেঞ্চের রেগুলার প্যাসেঞ্জার….লাস্ট বেঞ্চে বসা মানেই কিন্তু খারাপ নয় যদিও ছেলেটি ধারাবাহিকতার সাথে খারাপ রেজাল্ট টাই করতো….স্কুলের মধ্যে ভালো লাগা, ভালোবাসা, প্রেমে পড়া টা কিন্তু অনেকটা নিয়ম মেনেই আসে, ..নিয়মের বাইরে ওই ছেলেটাও ছিল না, ভালো লেগে যায় অমৃতা কে ….অগত্যা বলেও দেয় অমৃতা কে ভালোবাসার কথা, কিন্তু অমৃতার উত্তর ‘না’ বলেই থমকে ছিল না বরং উল্টে ছেলেটিকে অপমান করে ..”তোর জীবনটাই লাস্ট বেঞ্চের , আমি লাস্ট বেঞ্চের জীবন চাইনা”, অপমান করেও থেমে থাকে নি অমৃতা, শেষমেশ স্যার কেও বলে দেয়.. অমৃতার বাবা স্কুলের সেক্রেটারি, রাজনীতির লোক বলে কথা, এলাকায় নাম ডাক আছে ….তাই মেয়ে কে এমন প্রস্তাব সহ্য করতে পারলো না বাবা, ভালোবাসার প্রস্তাব টাই চালনা করা হলো কুপ্রস্তাবে, ভালো লাগার কথা টাই চালনা করা হলো ডিস্টার্ব এ ….তাই ছেলেটির গার্জেন কে ডেকে অপমান ও ছেলেটিকে টিসি দেওয়া হলো ….

আজ অমৃতার ইমেলে লেখা আছে শুধু “সেদিন রাহুলের স্কুল বদলায়নি, জীবনটাও বদলে গেছলো, ধন্যবাদ রাহুল এন্টারপ্রাইজ আসার জন্য কিন্তু আমরা আরো বেটার কাউকে চাই এই চাকরির জন্য কারন এই চাকরির পোস্টটি আমার পার্সোনাল সেক্রেটারি হবার ছিল, তুমি যোগ্য নও ”

কেমন লাগলো অবশ্যই জানান