শুভ বিজয়া

0
849
Image Source : Google

পাড়ার ছেলেদের সাথে পূজোর চাঁদা কাটতে বেড়িয়ে পাড়ায় নতুন বাড়িটার কথা মনে পড়ল রাতুলের, গতমাসেই নতুন এসেছে তারা। নতুন পাড়ায় কেউ এলে চাঁদাটাও তখন একটু বেশি হয়ে যায় এটাই পাড়ার নিয়ম। ১০০১ টাকা চাঁদার বিল টা আগের থেকে যত্ন সহকারে কেটে পকেটে পুরে রেখে কলার টা তুলে রাতুল বাকি ছেলেদেরকে বলল- তোরা এখানেই দাঁড়া আমি দেখছি”, দরজায় কলিং বেলটা বাজানোর পরেই এলোমেলো খোলা চুলে সাদা ছাপা নাইটিটা পরে ঊনিশ কুড়ি বছরের এক সুন্দরী বেড়িয়ে এলো, প্রথম দেখাতেই রাতুল স্তম্ভিত, দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে মূল বক্তব্য কখন হারিয়ে গেছে তার, উচ্চতা মোটামুটি 5’6″ স্লিম, গায়ের রঙ তো দুধে আলতা, আর চোখদুটির বিবরণ? শুধু তার কপালেই চোখ নেই, থাকলে মহাষষ্ঠীর বোধনটা আজই হয়ে যেত হয়তো। “বাবা বাড়ি নেই, পড়ে আসুন।” কথাটি বলেই মেয়েটি দরজাটা লাগিয়ে দিলো। বাপরে কি দাপট মেয়ের। সুন্দরীদের এরকম একটু অহংকার তো হয়েই থাকে।

সেই প্রথম দেখাতেই রাতুল তার হৃদস্পন্দনের শব্দ অনুভব করল? তারপর সে হয়তো বাড়ি ফিরে এসেছিলো, কিন্তু তার মনটা ঐ বাড়ির দুয়োরের পাপোষেই ছেড়ে এসেছিলো? তারপর থেকেই সেই বাড়িটির ওপর কড়া নজরদারি চালিয়ে যাওয়া। বিপিনের চায়ের দোকানের আড্ডাটা ট্রান্সফার হল সেই বাড়ির সামনের রাস্তাটায়। মহালয়ার ভোরে বন্ধুদের সাথে বোম ফাটানোর সময় নজর বারবার গেছে সেই বাড়িটির দিকে? মেয়েটির দোতলার ঘরটা থেকে মহালয়ার রেডিওর শব্দটা যখন ভেসে আসছিল তখন পাইপ বেয়ে ওপরে উঠতে ইচ্ছে করেছিল বারবার? বাজি পটকার শব্দে যখন দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মেয়েটি “জানোয়ার ছেলে” বলে শাসিয়েছিল তখন রাতুলের চোখটা দোতলার ব্যালকনির রেলিং-এই থমকে গিয়েছিল? মহাপঞ্চমীর বিকেলে মণ্ডপে যখন প্রতিমা এলো, রাতুল দেখলো সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে দোতলার ব্যালকনি থেকে তখন পাড়ার বাকি ছেলেগুলোকে বীরত্ব দেখানো রাতুলের,-“সর সর সরে যা সব, আমি একাই ঠাকুর নামাতে পারব!”

মহাষষ্ঠীর সকাল থেকে মনে শুরু হওয়া উসখুসুনির পর্ব আর প্রেমের পূর্বরাগ, সেই সন্ধ্যায় তাকে মণ্ডপে একবার দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা রাতুলের? কিন্তু তাকে বোধহয় বেরোতে দেয়নি বাড়ি থেকে নতুন অচেনা পাড়ায়। মহাসপ্তমীর সকালে প্রথমবার ওকে মণ্ডপে দেখলো রাতুল বাবা মায়ের সাথে। বারবার মনে হয়েছিল “একবার পরিচয় করি!” বন্ধুদের নজর সেই মেয়েটির দিকে যাওয়ার পর, তাকে নিয়ে তাদের ঠাট্টা তামাশা হচ্ছে দেখে তাদের সাবধান করে দেওয়া “ওটা তোদের বৌদি হয়!” একদিকে ঢাকের শব্দ অন্যদিকে দুটো চোখ দেবীদর্শনে মত্ত। পার্থক্য এটাই এই দেবীর রূপ মৃণ্ময়ী নয়।

কি অদ্ভুত সেই তুমি, তোমায় দেখলেই প্রেম প্রেম পায়, সাথে ভয়ও, বন্ধুরা বিভিন্ন রকম উপদেশ দিচ্ছে, কেউ বলছে- “না ভাই যাস না ওদিকে, মরবি” কেউ বলছে- “প্রোপোজ করে দে ভাই, নাহলে বেহাত হয়ে যাবে” বন্ধুরা প্রেমে পড়লে সবাই প্রেমে এক একজন এক একরকম বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে। তবে সেই যাত্রার ইতি টানলো মহাষ্টমীর সকাল, সেই প্রথম হলুদ শাড়ি খোলাচুলে রাতুলের দেবীদর্শন, কিন্তু একসাথে অঞ্জলীটা বোধহয় খুব কমজনের ভাগ্যেই থাকে। মেয়েটি মণ্ডপে প্রবেশ করল সাথে নীল পাঞ্জাবী পড়া একজন। চোখ ভিজে ওঠে রাতুলের, প্রত্যেকটা মুহূর্ত ছায়ার মতন লেগে ছিল তার সাথে ছেলেটি। সকাল থেকে একসাথে অঞ্জলী দেবে বলে উপোস তার, মা দুর্গার কাছে আজ ভেবেছিল সে কিছু চাইবে, চাইলো তো বটেই- “ভালো থেকো তুমি!” বাড়ি এসে কি ভীষণ কান্না তার, নবমীটা ঘরে বসেই কাটিয়ে দিলো সে, আর ঐ প্যাণ্ডেল মুখো হয়নি।

দূর থেকে আসছে ঢাকের শব্দ, সাথে আগামীকালের বিসর্জনের বার্তা। দশমীর সন্ধ্যায় রাতুলদের পাড়ার ছোট্ট একটি ছেলে রাতুলদের বাড়ি এল- তার হাতে একটি ছোট্ট কাগজ, মুখে আধো আধো কথা- “লাতুলদা দিদি তোমাকে দিতে বলল এতা!” রাতুল কাগজটি খুলে দেখলো তাতে লেখা- “ওটা আমার দাদা ছিল! শুভ বিজয়া” ❤
(লেখা – প্রীতম গুহ)

কেমন লাগলো অবশ্যই জানান